রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও সঙ্গীতকার কবীর সুমন পাচ্ছেন ডি লিট

 

সংবাদদাতা, কল্যাণী :
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মান ডি লিট পাচ্ছেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। ১ নভেম্বর ২০১৮ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর হাত দিয়ে এই সম্মান তুলে দেওয়ার বিশাল আয়োজন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য শঙ্কর কুমার ঘোষ। বাংলার গর্ব ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও বিশিষ্ট সঙ্গীতকার কবীর সুমন-এর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে। তিনি হয়েছিলেন ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি। জুলাই মাসে ২০১২ সালে কার্যভার গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবন ছয় দশকব্যাপী। তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী ও কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় সমস্যা-সমাধানকারী নেতা।

ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী তিনি। ১৯৩৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের মিরাটি গ্রামে তার জন্ম। বাবার নাম কামদাকিঙ্কর মুখার্জি ও মা রাজলক্ষ্মী দেবী।

বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী কামদাকিঙ্কর ১৯২০ সাল থেকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনাকালে তিনি ১০ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। পরে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হন কামদাকিঙ্কর।

ভারতের রাজনীতিতে চানক্য বলে পরিচিত প্রণব মুখার্জি ইতিহাস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করে আইন বিভাগেও পাস করেন।

একজন কলেজ শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেন। এ সময় ‘দেশের ডাক’ নামক একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়া বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ট্রাস্টি ও পরে নিখিল-ভারত বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিও হন প্রণব।

১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই বাংলাদেশের নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা গ্রামের শুভ্রা মুখার্জির সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ১৯৬৯ সালে প্রথম রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন প্রণব মুখার্জি। সেই থেকে তার যাত্রা শুরু।

আরও পড়ুন   রাহুলের আমেঠি সফরে ভীত বিজেপি

রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, রাজস্ব ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী। ভারত-মার্কিন বেসামরিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। দলের প্রতি আনুগত্য ও অসামান্য প্রজ্ঞা এ বাঙালি রাজনীতিককে কংগ্রেস দলে এবং দলের বাইরে বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র করেছে। সাউথ ব্লকে তিনি পরিচিত ড্যামেজ কনট্রোল ম্যানেজার রূপে।

দেশের প্রতি অবদানের জন্য তাকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ ও শ্রেষ্ঠ সংসদ সদস্যের পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাজ্যের ইউরোমানি পত্রিকার এক সমীক্ষায় তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রীর অন্যতম হিসেবেও বিবেচিত হন।

প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণময়। প্রায় পাঁচ দশক ভারতীয় সংসদের সদস্য তিনি। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রথমবারের মতো রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ ও ১৯৯৯ সালে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে কেন্দ্রীয় শিল্প উন্নয়ন উপমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ক্যাবিনেটে যোগদান করেন। ক্যাবিনেটে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতির পর ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির হত্যার অব্যবহিত পর একটি দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের শিকার হন প্রণব মুখার্জি। এ সময় প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাকে নিজের ক্যাবিনেটে স্থান দেননি। এ সময় তিনি রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে নিজস্ব একটি দলও গঠন করেছিলেন। তবে ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে সমঝোতা হলে এ দল নিয়ে তিনি আবার কংগ্রেসে যোগ দেন।

পরবর্তীতে পি.ভি নরসিমা রাও তাকে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নিযুক্ত করলে তার রাজনৈতিক কর্মজীবনের পুনরুজ্জীবন ঘটে। রাওয়ের মন্ত্রিসভায় পরে তিনি ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবেও যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ শাখারও সভাপতি ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংহের বাইপাস সার্জারির সময় তৎকালিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি রাজনীতিবিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটির চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

আরও পড়ুন   হরিয়ানার বিজেপি-তে ভাঙন, নতুন দল গড়লেন বিজেপি সাংসদ

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও তার সুখ্যাতি রয়েছে। ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর প্রণব মুখার্জি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইস সেকশন ১২৩ চুক্তি সই করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য।

১৯৮৪ সালে তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত গ্রুপ অব টোয়েন্টিফোরের সভাপতিত্ব করেন। ১৯৯৫ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিনি সার্ক মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলনেও সভাপতিত্ব করেছিলেন।

২০১২ সালের ২২ জুলাই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি

কবীর সুমন-এর জন্ম: ১৬ মার্চ ১৯৪৯ একজন ভারতীয় বাঙালি গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা, বেতার সাংবাদিক, গদ্যকার ও সংসদ সদস্য। তাঁর পূর্বনাম সুমন চট্টোপাধ্যায়। ২০০০ সালে
ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি তাঁর পুরনো নাম পরিত্যাগ করেন। সুমন একজন বিশিষ্ট আধুনিক ও রবীন্দ্রসংগীত গায়ক। ১৯৯২ সালে তাঁর তোমাকে চাই অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি বাংলা গানে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। তাঁর স্বরচিত গানের অ্যালবামের সংখ্যা পনেরো। সঙ্গীত রচনা, সুরারোপ, সংগীতায়োজন ও কণ্ঠদানের পাশাপাশি গদ্যরচনা ও অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি স্বকীয় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধিক প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছোটোগল্পের রচয়িতা এবং হারবার্ট ও চতুরঙ্গ প্রভৃতি মননশীল ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের রূপদানকারী। বিশিষ্ট বাংলাদেশি গায়িকা
সাবিনা ইয়াসমিন তাঁর বর্তমান সহধর্মিনী। নন্দীগ্রাম গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিজমি রক্ষার ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন এবং সেই সূত্রে সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর আবির্ভাব ঘটে।
২০০৯ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে দেশের পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন ও জয়লাভ করে উক্ত কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন।

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মান ডি লিট পাচ্ছেন সঙ্গীতকার কবীর সুমন।
ইতিপূর্বে অনেক সম্মান তিনি পেয়েছেন। কিন্তু কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি লিট এর আগে তিনি পান নি!এই সম্মান পাবেন একথা কখনও ভাবেননি তিনি।
বিশ্ববাসী তাঁকে গানওয়ালা হিসেবে চেনেন।সঙ্গীত জগতে অশেষ অবদান রাখার জন্য কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ সম্মান ডি লিট দিয়ে সম্মানিত করতে চলেছে।
১ নভেম্বর ২০১৮ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর হাত দিয়ে এই সম্মান তুলে দেওয়া হবে। বাংলার গর্ব কবীর সুমন-এর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন   গ্রামে থাকতে হলে দাড়ি রাখা যাবে না, টুপিও পড়া যাবে না

সাম্মানিক ডি এস সি দেওয়ার হবে আইআইটির ডিরেক্টর ড. পার্থ প্রতিম চক্রবর্তীকে।

বিশেষ সূত্রে প্রকাশ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বুধবার কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্ট মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কবীর সুমনকে ডি লিট দেওয়া হবে এই সংবাদ চারিদিকের ছড়িয়ে পড়তে দারুণ খুশির হাওয়া বইছে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। গলা মিলিয়ে কেউ কেউ বলছেন ‘তোমাকে চাই’খ্যাত কবীর সুমনকে এই বিরল সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ও অধ্যাপক ড. দেবাংশু রায় ও উপাচার্য শঙ্কর কুমার ঘোষকে কুর্নিশ।
কবীর সুমনের ভক্তকুল এই সংবাদ জেনে গর্বিত ও দারুণ খুশি হবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


  • Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
    error: